রবিবার , ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. কিশোর সংবাদ
  6. খেলাধুলা
  7. গ্রাম-অঞ্চল
  8. জাতীয়
  9. ধর্ম
  10. প্রবাসী
  11. প্রাণী জগৎ
  12. বাজার হাট
  13. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  14. বিনোদন
  15. ভূতের আড্ডা

তিন গভর্নর যেভাবে ব্যাংক খাতে অনিয়মের সহযোগী হয়ে ওঠেন

প্রতিবেদক
Janatar Kagoj
ডিসেম্বর ২৯, ২০২৪ ১১:৩১ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক : আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় ব্যাংক খাতের সংস্কার সাধন। কারণ, আগের সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এই খাতের। সে জন্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ব্যাংক খাতকে কৃষ্ণগহ্বরের (ব্ল্যাকহোল) সঙ্গে তুলনা করেছে। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ এখন ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। খাতটি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় সংস্থার সহায়তায় ব্যাংক দখল হয়েছে। একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতেই সাতটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়। এই সুযোগে বড় অঙ্কের অর্থ দেশের বাইরে পাচার করা হয়।
দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সর্বোচ্চ ক্ষমতা গভর্নরের হাতে। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদেরও চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতা নেওয়ার দিনে গভর্নর ছিলেন বর্তমান অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। ওই বছরের ৩০ এপ্রিল তাঁর মেয়াদ শেষ হলে নতুন গভর্নর হন আতিউর রহমান। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পরে তিনি পদত্যাগ করেন। তাঁর সময়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নতুন ব্যাংক অনুমোদন ও ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দিয়ে বিতর্কিত হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

২০১৬ সালে সাবেক অর্থসচিব ফজলে কবির গভর্নর হলে একের পর এক ব্যাংক দখল হতে থাকে। এসব ব্যাংকে নির্বিচার লুটপাট শুরু করে দখলকারীরা। নতুন ব্যাংক অনুমোদন ও ঋণ নীতিমালায় ছাড় দিয়ে খেলাপি ঋণ গোপন করার কৌশলও দেখা যায় তাঁর সময়ে। ২০২২ সালে গভর্নর পদে বসানো হয় আরেক সাবেক অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদারকে। তাঁর আমলেও আগের ধারা অব্যাহত থাকে। পাশাপাশি টাকা ছাপিয়ে দেওয়া হয় লুটপাট হওয়া ব্যাংকগুলোকে। এসব টাকাও ঋণের নামে বের হয়ে যায়। এভাবে লুটপাটের সহযোগী হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে আব্দুর রউফ তালুকদার লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান এবং পদত্যাগ করেন।

২০০৯ সালের পয়লা মে গভর্নর পদে নিয়োগ পান আতিউর রহমান। তাঁর মেয়াদের শুরুতে ততটা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে দুর্বলতা দেখা দেয়। এই সুযোগে সোনালী ব্যাংকে হলমার্কের জালিয়াতি ফাঁস হয়। এর জেরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শে সোনালী ব্যাংকের পর্ষদে পরিবর্তন আনে সরকার। তবে তাঁর সময়ে আবার বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতি হলেও রাজনৈতিক চাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চেষ্টা করেও তা রুখতে পারেনি। ২০১২ সালে নতুন ব্যাংক অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হলে কারা তা পাবেন, সেই তালিকা সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে গভর্নরকে দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী আওয়ামী লীগ নেতাদের ৯টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বেসরকারি উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তখন সুবিধা পায় বেক্সিমকো, এমআর গ্রুপ, এসএ গ্রুপ, রতনপুর গ্রুপ, কেয়া গ্রুপ, যমুনা, থার্মেক্স, শিকদার, আবদুল মোনেম ও এননটেক্স গ্রুপ। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে। ওই সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে ইসলামী ব্যাংকে পরিবর্তনের দাবি ওঠে। তখন সেই পথে না গিয়ে আতিউর রহমান চার স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে ব্যাংকটির তদারকি জোরদার করেন। ফলে তাঁর মেয়াদে রক্ষা পায় ইসলামী ব্যাংক। তবে আত্মপ্রচার তাঁকে বিতর্কিত করে।
এ নিয়ে আতিউর রহমানের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

২০২২ সালের জুলাইয়ে আরেক সাবেক অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার গভর্নর পদে দায়িত্ব নেন। তাঁর আমলেও আগের মতো বেনামে ঋণ ও জালিয়াতি করে ঋণ বিতরণের ধারা অব্যাহত থাকে। তিনি অনিয়ম বন্ধে উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হন। পরে অনিয়মে যুক্ত ব্যবসায়ীদের সহযোগী হয়ে পড়েন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর সময়ে টাকা ছাপিয়ে লুটপাট হওয়া ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়। এসব টাকাও ঋণের নামে তুলে নেয় এস আলম গ্রুপ। আবার রিজার্ভ থেকেও ডলার দেওয়া হয় তৎকালীন সরকারের কাছের ব্যবসায়ীদের। তাঁর সময়ে আর্থিক তথ্য প্রকাশ সীমিত করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সাংবাদিকদের প্রবেশও বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারের পতন ঘটলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে পদত্যাগ করেন। তাঁর ফোন বন্ধ রয়েছে। তাইতাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি
আওয়ামী লীগ আমলে নামে-বেনামে নেওয়া ঋণ এখন খেলাপি হতে শুরু করেছে। ২০০৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার মতো, যা গত সেপ্টেম্বরে প্রায় ১৩ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসেই ব্যাংকব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংক থেকে বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশই বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়। তিনি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে আগামী দিনে মোট ঋণের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছে যাবে। এসব ঋণের বড় অংশই ২০১৭ সালের পর দেওয়া হয়েছে, যার বড় অংশই পাচার হয়ে গেছে।
সম্প্রতি ব্রিটিশ গণমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আহসান এইচ মনসুর বলেন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) সহায়তায় কয়েকটি ব্যাংক দখল করার পর এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর সহযোগীরা ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ‘অন্তত’ ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ‘বের করে’ নিয়েছেন। তাঁরা প্রতিদিনই নিজেদের নামে ঋণ অনুমোদন করেছেন। এসব ব্যাংক দখল করে আনুমানিক ২ লাখ কোটি টাকা (১ হাজার ৬৭০ কোটি ডলার) দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে।
জানা গেছে, এস আলম গ্রুপ একাই ইসলামী ব্যাংকের দেওয়া মোট ঋণের প্রায় অর্ধেক বা ৭৩ হাজার কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ঋণের ৬৪ শতাংশ বা ১৮ হাজার কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৬০ শতাংশ বা ৩৫ হাজার কোটি টাকা ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯০ শতাংশ নিয়ে গেছে। একইভাবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক এবং ইউসিবিতেও গ্রুপটির ঋণ রয়েছে। এদিকে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী (জাভেদ) ইউসিবি থেকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান আইএফআইসি ব্যাংক থেকে, সিকদার পরিবার ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ তুলে নিয়েছে। এসব ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ছে।

সর্বশেষ - আইন আদালত