তিউনিসিয়ার পরিচালক লোতফি আসুর দু’হাত ভরে কাড়ি কাড়ি ডলার পেলেন। একই মঞ্চ থেকে তিনি বাগিয়ে নিয়েছেন ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা! সৌদি আরবের জেদ্দায় রেড সি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের চতুর্থ আসরে সেরা ছবির পুরস্কার জিতেছে তার পরিচালিত ‘রেড পাথ’। এটি নির্মাণের জন্য সেরা পরিচালক হয়েছেন তিনি। সেরা চলচ্চিত্রের জন্য সোনালি ইউসর ট্রফি ও ১ লাখ ডলার (১ কোটি ২০ লাখ টাকা) এবং সেরা পরিচালক হিসেবে ১০ হাজার ডলার (১২ লাখ টাকা) পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছে তাকে।


গত ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় জেদ্দার প্রাণকেন্দ্র আল-বালাদ শহরের কালচার স্কয়ারে ছিল পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। বিজয়ীদের হাতে ট্রফি তুলে দেন বিচারকরা। এবারের আসরে প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন খ্যাতিমান আমেরিকান নির্মাতা স্পাইক লি। তার নেতৃত্বে ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান তারকা ড্যানিয়েল ডে কিম, মিসরীয়-অস্ট্রিয়ান লেখক-পরিচালক আবু বকর শওকি, আমেরিকান অভিনেত্রী মিনি ড্রাইভার এবং তার্কিশ অভিনেত্রী তুবা বিয়ুকুস্তুন।

গত সেপ্টেম্বরে ৭৭তম লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের ফিল্মমেকার্স অব দ্য প্রেজেন্ট বিভাগে লোতফি আসুর পরিচালিত ‘রেড পাথ’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। এরপর ভ্যানক্যুভার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ভ্যানগার্ড বিভাগে অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড জিতেছে ছবিটি। গত মাসে ৫৫তম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়ায় (আইএফএফআই) আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে স্বর্ণময়ূর পুরস্কারের জন্য লড়েছে এটি।
আরবি ভাষায় নির্মিত ১ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট দৈর্ঘ্যের ‘রেড পাথ’ ছবির গল্প সত্যি ঘটনায় অনুপ্রাণিত। এতে দেখা যায়, বালক আশরাফ চাচাতো ভাই নিজারের সঙ্গে

তিউনিসিয়ার মঘিলা পর্বতে বেড়াতে যায়। তাদের ওপর হামলা চালায় জিহাদি সন্ত্রাসীরা। তারা নিজারকে হত্যা করে। তার কাটা মাথা একটি উদ্দেশ্যে আশরাফকে বাড়ি নিয়ে যেতে বলে সন্ত্রাসীরা। ছবিটিতে আশরাফ চরিত্রে আলি হেলালি ও নিজার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইয়াসিন সামুনি। তিউনিসিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, সৌদি আরব ও কাতারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রযোজনায় তৈরি হয়েছে এটি।

দ্বিতীয় সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে রুপালি ইউসর ও ৩০ হাজার ডলার (৩৬ লাখ টাকা) পেয়েছে ডেনিশ-ফিলিস্তিনি পরিচালক মাহদি ফ্লেইফেলের ‘টু অ্যা ল্যান্ড আননোন’। গত মে মাসে ৭৭তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের সমান্তরাল বিভাগ ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইটে নির্বাচিত হয় এটি। এরপর টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এর উত্তর আমেরিকান প্রিমিয়ার হয়। ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের ছবিটির গল্প গ্রিসের অ্যাথেন্সে বসবাস করা ফিলিস্তিনি শরণার্থী শাতিলা ও রিদাকে কেন্দ্র করে, জার্মানি যাওয়ার জন্য জাল পাসপোর্ট কিনতে যতটা সম্ভব অর্থ জমানোর চেষ্টা করে তারা। এর আগে রিদা হেরোইনের পেছনে সমস্ত অর্থ ব্যয় করার পর শাতিলা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ চোরাচালানের চক্রান্তে আকৃষ্ট হয়।
দুবাইয়ে জন্ম নেওয়া মাহদি ফ্লেইফেল ২০১২ সালে ‘অ্যা ওয়ার্ল্ড নট আওয়ার্স’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। দীর্ঘ একযুগ পর দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ‘টু অ্যা ল্যান্ড আননোন’ বানিয়েছেন তিনি। ছবিটিতে শাতিলা চরিত্রে অনবদ্য নৈপুণ্যের সুবাদে সেরা অভিনেতা হয়েছেন ফিলিস্তিনি তারকা মাহমুদ বাকরি।

খর্বকায় তথা বামনদের নিয়ে তাগরিদ আবুল হাসান পরিচালিত রোমান্টিক-কমেডি ‘স্নো হোয়াইট’-এর জন্য সেরা অভিনেত্রী হয়েছেন ৩ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার নারী মরিয়ম শেরিফ। তিনি ইমান চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যে প্রেম, বিয়ে ও সামাজিক প্রত্যাশার বিভিন্ন জটিলতার

সম্মুখীন হয়। আরব সমাজে খর্বকায় মানুষদের দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ ও তাদের সামাজিক উপলব্ধি মোকাবিলার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে ছবিটিতে। ২০১৯ সালে এটি এল গুনা চলচ্চিত্র উৎসবের আমেরিকান ফিল্ম শোকেস বিভাগে নির্বাচিত হয়। ২০২০ সালে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) অ্যাওয়ার্ড জিতেছে ‘স্নো হোয়াইট’।
জুরি প্রাইজ হিসেবে ১০ হাজার ডলার (১২ লাখ টাকা) পেয়েছে মিসরের খালেদ মনসুর পরিচালিত ‘সিকিং হ্যাভেন ফর মিস্টার র্যাম্বো’। এর মাধ্যমে গত সেপ্টেম্বরে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ১২ বছর পর মিসরের কোনও ছবির প্রদর্শনী হয়েছে। ছবিটির গল্পে দেখা যায়, হাসান তার প্রিয় কুকুর র্যাম্বোর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে। কারণ কুকুরটি তাদের বাড়িওয়ালার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে।

‘সংস অব আদম’ ছবির পরিচালক ইরাকের অদায় রশীদ সেরা চিত্রনাট্যকার হিসেবে ১০ হাজার ডলার (১২ লাখ টাকা) পেয়েছেন। ১৯৪৬ সালে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার পটভূমিতে নির্মিত ছবিটির গল্প ১২ বছর বয়সী আদমকে ঘিরে, যে কখনোই বড় না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়!
চতুর্থ রেড সি উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে আরব অঞ্চল, এশিয়া ও আফ্রিকার ১৫টি চলচ্চিত্র। এরমধ্যে ছিল বাংলাদেশের মাকসুদ হোসেন পরিচালিত ও মেহজাবীন চৌধুরী পরিচালিত ‘সাবা’।
উদীয়মান তারকা হিসেবে চপার্ড ইমার্জিং সৌদি ট্যালেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন সৌদির অভিনেত্রী রুলা দাখিলাল্লাহ। এবারের উৎসবে আরব স্পেক্টেক্যুলার বিভাগে প্রদর্শিত ‘মাই ড্রাইভার অ্যান্ড আই’ ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। সেরা সৌদি চলচ্চিত্র হিসেবে ফিল্ম আলউলা অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড ও ৩০ হাজার ডলার (৩৬ লাখ টাকা) পেয়েছে আব্দুল আজিজ আলশালাহেই পরিচালিত ‘হোবাল’। নব্বই দশকের পটভূমিতে এর গল্প একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে, যারা অগ্রজের বলে যাওয়া কঠোর নির্দেশনা মেনে মরুভূমিতে পড়ে থাকে। কিন্তু একের পর এক ঘটনা পরিবারটির ভিত নাড়িয়ে দেয়।

মেক্সিকোর সান্তিয়াগো ম্যাজার ‘স্টেট অব সাইলেন্স’ সেরা প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে ১০ হাজার ডলার (১২ লাখ টাকা) পেয়েছে। মেক্সিকোতে মাদক-রাজনীতি ও পদ্ধতিগত দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যতা ও স্বচ্ছতার খোঁজে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া চার সাংবাদিকের বিপদসঙ্কুল অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে এতে। মেক্সিকান দুই অভিনেতা গায়েল গার্সিয়া বার্নাল ও ডিয়েগো লুনা প্রামাণ্যচিত্রটির দুই নির্বাহী প্রযোজক। ট্রাইবেকা চলচ্চিত্র উৎসব ও গুয়াদালাখারা চলচ্চিত্র উৎসবে একইসঙ্গে এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়।
সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে গোল্ডেন ইউসর ও ২৫ হাজার ডলার পেয়েছে ইরানি-কানাডিয়ান নির্মাতা আলি রেজা কাজেমিপুর ও পান্তা মোসলেহ পরিচালিত ‘হ্যাচ’। ১১ মিনিটের ছবিটিতে দেখা যায়, পানির ট্রাকে থাকা ট্যাংকে লুকিয়ে আছে একদল আফগান শরণার্থী, যারা সীমান্ত পেরোতে চায়।

দ্বিতীয় সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে ১২ হাজার ৫০০ ডলার পেয়েছে ইথিওপিয়ার বিজা হাইলু লেমা পরিচালিত ‘আলাজার’। ইথিওপিয়ায় মারাত্মক খরার কারণে কৃষকরা একে একে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। গল্পের মূল চরিত্র টেসেমা একই সিদ্ধান্ত নেয়। এরমধ্যে তার বাবা দুর্ঘটনায় মারা যায়। কিন্তু সমাধি থেকে মরদেহ উধাও হয়ে গেলে স্থানীয় এক ধর্মযাজক এই ঘটনাকে ঐশ্বরিক ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু টেসেমা সত্য জানতে তদন্ত শুরু করে।

এবারের রেড সি উৎসব শুরু হয় গত ৫ ডিসেম্বর। উদ্বোধনী আয়োজনসহ গোটা আসরে অতিথি হিসেবে মরুর বুকে এসেছিলেন হলিউড ও বলিউডের হেভিওয়েট তারকারা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনি ডেপ, উইল স্মিথ, অ্যান্ড্রু গারফিল্ড, নিক জোনাস, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, রণবীর কাপুর, কারিনা কাপুর খান, শ্রদ্ধা কাপুর, ফারহান আখতার প্রমুখ। রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) এর পর্দা নেমেছে।

রেড সি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৪ বিজয়ী তালিকা
সেরা চলচ্চিত্র (১ লাখ ডলার): রেড পাথ (লোতফি আসুর, তিউনিসিয়া)
সেরা চলচ্চিত্র (৩০ হাজার ডলার): টু অ্যা ল্যান্ড আননোন (মাহদি ফ্লেইফেল, ফিলিস্তিন-ডেনমার্ক)
সেরা পরিচালক (১০ হাজার ডলার): লোতফি আসুর (চলচ্চিত্র: রেড পাথ, তিউনিসিয়া)
জুরি প্রাইজ (১০ হাজার ডলার): সিকিং হ্যাভেন ফর মিস্টার র্যাম্বো (খালেদ মনসুর, মিসর)
সেরা চিত্রনাট্যকার (১০ হাজার ডলার): অদায় রশীদ (সংস অব আদম, ইরাক)
সেরা অভিনেতা: মাহমুদ বাকরি (টু অ্যা ল্যান্ড আননোন, ফিলিস্তিন)
সেরা অভিনেত্রী: মরিয়ম শেরিফ (স্নো হোয়াইট, মিসর)
সেরা সিনেম্যাটিক অবদান (চিত্রগ্রহণ): টু কিল অ্যা মঙ্গোলিয়ান হর্স (তাও চু, মঙ্গোলিয়া)

স্পেশাল মেনশন: চিলড্রেন অব বারজাগ (আহমেদ খাত্তাব, সংযুক্ত আরব আমিরাত)
সেরা প্রামাণ্যচিত্র (১০ হাজার ডলার): স্টেট অব সাইলেন্স (সান্তিয়াগো ম্যাজা, মেক্সিকো)
চপার্ড ইমার্জিং সৌদি ট্যালেন্ট অ্যাওয়ার্ড: রুলা দাখিলাল্লাহ (সৌদি আরব)
ফিল্ম আলউলা অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড-সৌদি চলচ্চিত্র (৩০ হাজার ডলার): হোবাল (আব্দুল আজিজ আলশালাহেই)
ফিল্ম আলউলা অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড (অন্যান্য দেশের চলচ্চিত্র): লিটল জাফনা (লরেন্স ভ্যালাঁ, ফ্রান্স)
সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র (২৫ হাজার ডলার): হ্যাচ (আলি রেজা কাজেমিপুর, পান্তা মোসলেহ; ইরান-কানাডা)
সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র (১২ হাজার ৫০০ ডলার): আলাজার (বিজা হাইলু লেমা, ইথিওপিয়া)





















