এটা কি আমাদের জগৎ আমাদের সমাজ
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে বিরোধী মতের মানুষকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের জন্য তৈরি করা ‘আয়নাঘর’ বা গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁও, কচুক্ষেত ও উত্তরা এলাকায় তিনটি স্থানে গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আদিলুর রহমান ও রিজওয়ানা হাসান এবং গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য ও দেশি-বিদেশি কয়েকজন সাংবাদিক প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন। এ ছাড়া এসব বন্দিশালায় নির্যাতনের শিকার কয়েকজন ভুক্তভোগীও ছিলেন তাদের সঙ্গে। সারা দেশে এ ধরনের ৭০০ থেকে ৮০০ আয়নাঘর আছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
আয়নাঘর পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আওয়ামী সরকারের আইয়ামে জাহিলিয়াতের একটা নমুনা আয়নাঘর। নৃশংস অবস্থা, প্রতিটি জিনিস যে রয়েছে এখানে। যতটা শুনি অবিশ্বাস্য মনে হয়, এটা কি আমাদের জগৎ, আমাদের সমাজ? যারা নিগৃহীত হয়েছে, যারা এটার শিকার হয়েছে, তারাও আমাদের সঙ্গে আছে এখানে, তাদের মুখে থেকে শুনলাম কীভাবে হয়েছে। কোনো ব্যাখ্যা নেই।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টাকে আগারগাঁওয়ের একটি নির্যাতনকেন্দ্রে ব্যবহৃত একটি বৈদ্যুতিক চেয়ার দেখানো হয়। একজন গুমের শিকার ব্যক্তি কচুক্ষেত এলাকায় প্রধান উপদেষ্টাকে নির্যাতন সেলের দেয়াল দেখান। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার শাসনামলে এসব গোপন বন্দিশালায় জিজ্ঞাসাবাদের নামে আটক ব্যক্তিদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হতো।
এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি গুম তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বৈঠকে কয়েকটি গুমের ঘটনার নৃশংস বর্ণনা প্রধান উপদেষ্টার সামনে তুলে ধরা হয়। ছয় বছরের শিশু গুম হওয়ার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে বলে সে সময় জানান কমিশন সদস্যরা। তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূস শিগগিরই আয়নাঘর পরিদর্শনে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ‘গুমের’ অভিযোগ তদন্তে গত ২৭ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের গুম তদন্ত কমিশন গঠন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন পর্যন্ত সময়ের সব অভিযোগ কমিশনের বিবেচনায় আনা হয়। কমিশন গত ১৪ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী একটি প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়। পরদিন প্রতিবেদনটির কিছু অংশ প্রকাশও করা হয়। ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ’ শিরোনামে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে গুমের বিচার প্রক্রিয়া শুরু এবং র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশও করা হয়।

কমিশনের অনুসন্ধান এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সরাসরি নির্দেশে আওয়ামী লীগ সরকারের গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে গুম, আটকে রেখে নির্যাতন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে হত্যার অভিযোগের একের পর এক ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরা হয়।
বিভিন্ন অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো ‘গুম, নির্যাতন ও ধরে এনে হত্যার’ মতো ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে। অনেক বাহিনীর কার্যালয়ে পাওয়া গেছে নির্যাতনের বিশেষায়িত যন্ত্র ও সাউন্ড প্রুফ কক্ষ। প্রতিবেদনে বিভিন্ন বাহিনীর দপ্তরে ‘আয়নাঘর’ বা তুলে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের দিনের পর দিন আটকে রাখার জন্য কক্ষ তৈরি করার কথা তুলে ধরা হয়।
৭০০ থেকে ৮০০ আয়নাঘর আছে: আয়নাঘর পরিদর্শন বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক দিন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। গতকাল বুধবার আয়নাঘর পরিদর্শন শেষে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি আরও বলেন, সারা দেশে ৮ শতাধিক আয়নাঘর ছিল। প্রতিটি আয়নাঘর খুঁজে বের করা হবে।
শফিকুল আলম জানান, আয়নাঘর পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘যা দেখেছি, তা অবর্ণনীয়।’
প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার, অপূর্ব জাহাঙ্গীর, সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহমদ ও সহকারী প্রেস সচিব সুচিস্মিতা তিথি।



















